বস্ (BOSS) বনাম অভিভাবক
বস্ (BOSS) বনাম অভিভাবক
-মুহাম্মাদ দিদারুল আলম।
স্রোতের বিপরীতে (Opposite Swimming) লিখাই আমার কাজ । গত 19/10/2022ইং একটি বেসরকারী অফিসে একজন কর্মকর্তার বিদায়সভা ছিল। গধবাঁধা ছকআঁকা এ ধরনের অনুষ্ঠানের বক্তাগণ সকলে কাঠামোবদ্ধ নির্ধারিত কিছু কথারই পূণরাবৃত্তি করে থাকেন। অফিসের প্রধান কর্তার উপস্থিতিতে তার গুণকীর্তন ছাড়াতো আর বক্তব্য দেয়া যায় না। তাই প্রত্যেকে বক্তব্যের শুরুতে কিছুক্ষণ প্রধান কর্তার (Boss) মহান শানে অতিকথা, রূপকথা ও প্রশংসা-কীর্তনের ফূলঝুড়ি উড়ায়। সেদিন তৈলাক্ত বক্তাগণের পিচ্ছিল মুখ দিয়ে উচ্চারিত অতিপূণরাবৃত্ত কমন একটি শব্দ আমার দৃষ্টি কাড়ে আর তা হল বসকে ’অভিভাবক’ (Guardian) শব্দের মোড়কে অলংকৃতকরণ- ‘আমাদের একান্ত অভিভাবক…’, ‘পরমপ্রিয় অভিভাবক…’, ’মহান অভিভাবক…’ ইত্যাদি।
অফিসের বস নিজেও একজন চাকুরে। তিনি দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হিসেবে মালিকের প্রতিনিধিও। বস তো বস-ই। তিনি আপনার প্রশাসক, আপনার তত্ত্বাবধায়ক, আপনার সহকর্মী, আপনার সতীর্থ সহগামী, আপনার কলিগ ও বন্ধু- এ ধরনের আরো অনেক শব্দ দিয়ে তার পরিচয় তোলে ধরা যায়। কিন্তু বসের সাথে অভিভাবকত্বের কী সম্পর্ক? এটা একজন স্বাধীন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষের মানসিক হীনমন্যতা ও আত্মমর্যাদাবোধের দেউলিয়ত্বের বহি:প্রকাশ।
আইনশাস্ত্রে অভিভাবক শব্দটি চরম অসহায়ত্ব ও পরনির্ভশীলতার প্রতি ইঙ্গিত করে। আমাদের দেশে আঠারো পেরিয়ে পূর্ণ সাবালকত্ব প্রাপ্তির পর একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের কোন আইনি অভিভাবক থাকে না। যে কোন জায়গায় পরিচিতির জন্য নিজের নাম, পিতার নাম, মাতার নাম ও স্বামী/স্ত্রীর নাম প্রয়োজন পড়ে। এরপর অভিভাবকের নামোল্লেখ ব্যক্তির নাবালকত্ব (Minority) ও শারিরীক বা মানসিক পঙ্গুত্বই প্রমাণ করে।
অভিভাবক শব্দটির কাছাকাছি একটি আরবী প্রতিশব্দ হল ‘ওয়ালী’। প্রত্যেক সাবালক মুসলমানের অভিভাবক (ওয়ালী) হলেন একমাত্র আল্লাহ। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন-
”যাহারা ঈমান আনে আল্লাহ তাহাদের অভিভাবক, তিনি তাহাদিগকে অন্ধকার হইতে বাহির করিয়া আলোকে লইয়া যান। আর যাহারা কুফরী করে তাগূত তাহাদের অভিভাবক, ইহারা তাহাদিগকে আলোক হইতে অন্ধকারে লইয়া যায়।” (সুরা বাকারা, আয়াত- 257)।
এখানে অভিভাবক (ওয়ালী) শব্দের মাধ্যমে মহান আল্লাহ নিজেকে মানবজীবনের মৌলিক চিন্তাদর্শনের (Fundamental Beliefs) ক্ষেত্রে একমাত্র সঠিক পথপ্রদর্শক ও চুড়ান্ত নির্দেশনাদাতা বুঝিয়েছেন।
বলা হয়, অফিসের বস রূপক অর্থে অভিভাবক। আমিও বলি, কর্মস্থলের বসকে ‘পরম ও মহান অভিভাবক’ (এরপর আরো একটু অগ্রসর হয়ে Me Lord যদি না বলে থাকেন) সম্বোধন করে তার সুদৃষ্টি আকর্ষণ বা মনোরন্জনের (Oiling) চেষ্টা করাতে আইনগত বা শরয়ী কোন বাঁধা নেই, তবে রয়েছে চিন্তার কিছু খোরাক। এভাবে আপনি রূপক অর্থে সম্মানের আতিশষ্যে আপন মায়ের সামনে স্ত্রীর মাকে (শ্বাশুড়ি) ’আম্মা’ বলে ডাকতে পারেন। এ ডাকের মর্মবেদনার তীব্রতা একমাত্র গর্ভধারিনী ভূক্তভোগী মা-ই হাঁড়েহাঁড়ে অনুভব করে থাকেন। নিজের পিতা থাকতে খানকার পীর সাহেবকে বাবা/বাবাজান ডাকতে পারেন, সমগ্র জাতির বিশেষ ব্যক্তিকে জাতিরজনক মেনে নিতে সমস্যা কোথায়? অথবা দরবারের নুন খেয়ে কাউকে ’মা জননী’ উপাধিতে ভূষিত করলে দোষ কী? এভাবে আপনি রূপক অর্থের যুক্তিতে অনেক শব্দ ও পরিভাষার অপপ্রয়োগ চালিয়ে যেতে পারেন নির্দিধায়। তাইতো কর্মস্থলের প্রধান কর্তাকে অভিভাবক ডাকাতে ও তাকে অভিভাবক মানতে বিবেকের অরুচি দেখি না। আলকুরআনের বক্তব্য অনুযায়ী মু’মিনগণের একমাত্র অভিভাবক হলেন আল্লাহ আর কাফিরগণের অভিভাবক হলো তাগুত বা শয়তান।
এভাবে রূপকের মোড়কে অতিবচন, অতিকথন ও অতিরঞ্জন মানুষের চিন্তার ফাঁকফোকর গলিয়ে ইসলামের মৌলিক আকীদার অনেক ক্ষেত্রেও চিন্তাবিভ্রাট (Deviation & Distortion) ঘটায়।
(21/10/2022)

NIce
উত্তরমুছুন