Header Ads

Header ADS

খ্রিষ্টানদের ইসলাম বিদ্বেষের তত্ত্বরহস্য

 খ্রিষ্টানদের ইসলাম বিদ্বেষের তত্ত্বরহস্য

-মুহাম্মদ দিদারুল আলম।

Allah

বর্তমান প্রায় আটশো কোটি বিশ্বজনসংখ্যার মধ্যে ইসলাম ও খ্রিষ্টবাদ (Christianity) দু’টিই সংখ্যগরিষ্ঠ মানুষের আচরিত ও ক্রমবর্ধিষ্ণু ধর্ম। বিগত চৌদ্দশত বছরের ইতিহাস খ্রিষ্টান ও মুসলিমদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব-সংঘাত, বিদ্বেষ, অপপ্রচার, প্রতারণা ও দখলবিতাড়নের ইতিহাস। এ দু’টি ধর্ম নিজেদেরকে একেশ্বরবাদী ও আসমানি কিতাবের অধিকারী দাবি করলেও কখনো তাদের মাঝে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান কিংবা কোন বিষয়ে সমঝোতা হয়নি। ক্রুসেডের সানাই যে বেজে উঠেছিলো তার জ্বলন্ত অঙ্গার এখনো জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ভস্ম কর চলেছে দুনিয়ার আনাচেকানাচে শতশত জনপদ। ইসলাম ও মুসলিমদের প্রতি খ্রিষ্টানদের ঐতিহাসিক বিদ্বেষের নেপথ্যে রয়েছে কিছু অন্তর্নিহিত মৌলিক কারণ:

তওহিদ বনাম ত্রিত্ববাদ

ইসলাম ধর্মের মূল (Central belief) হল ‘তওহিদ’ বা একক অদ্বিতীয় আল্লাহ-তে নিরঙ্কুশ বিশ্বাস। সব কিছুর সৃজন-লয়, লালনপালন, মঙ্গল-অমঙ্গল এবং যাবতীয় কৃতকর্মের শাস্তি ও প্রতিদান ইত্যাদি সকল বিষয়ের মূলে রয়েছেন একমাত্র একজন সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহ। এর বিপরীতে খ্রিষ্টানদের উপস্থাপিত ত্রিত্ববাদ (The Trinity) বা ‘ত্রিত্বপাকের মাঝে ঈশ্বর এক’ধরনের জটিল কথার মারপ্যাঁচে তারা নিজেরা বিভ্রান্ত। এই ত্রিত্বপাক বা তিন খোদায় বিশ্বাসে বলা হয় পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মা (The Holy Ghost) তিনজনই ঈশ্বর অথবা একই ঈশ্বর এই তিন ভিন্ন সুরতে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। তাই তারা জনগণকে এই জটিল ঈশ্বরতত্ত্ব (Theocracy) বোঝার পরিবর্তে বিশ্বাস করে নেয়ার হেদায়তই বেশি দিয়ে থাকেন। ধর্ম হিসেবে ইসলাম ও খ্রিষ্টবাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও মৌলিক পার্থক্য এটি।

বাইবেলের বিকৃতি

খ্রিষ্টানদের ধর্মগ্রন্থ বাইবেলের (The New Testament) যত রূপ, যত বিকৃতি ও যত পরিবর্তিত সংস্করণ দুনিয়ার মানুষ দেখেছে; যত সমালোচনা এ গ্রন্থকে নিয়ে হয়েছে, যত স্ববিরোধী বক্তব্য ও ত্রুটি মানুষ এ গ্রন্থ থেকে আবিষ্কার করেছে- এমনটি অন্য কোন ধর্মগ্রন্থতো নয়ই কোন সাধারণ গ্রন্থের ক্ষেত্রেও হয়নি। অন্যদিকে চৌদ্দশত বছর ধরে চেষ্টা করেও সমালোচকেরা কুরআনের কোন যুক্তভিত্তিক ত্রুটি দূরের কথা একটি বর্ণের হেরফেরও দেখাতে পারেনি। এটি বিদ্বেষপরায়ণ খ্রিষ্টানদের জন্য মর্মজ্বালার অন্যতম কারণ। তাই কুরআনই হল বিকৃত ও পরিবর্তিত বাইবেলের একমাত্র সংশোধনকারী ত্রুটি নির্দেশিকা (Grammar Book) বা সংশোধক গ্রন্থ।

ইসলামের সার্বজনীনতা

ইসলাম সানবজাতির সামনে যে জীবনদর্শন পেশ করেছে তা সকল যুগের সকল দেশের ও সকল শ্রেণির মানুষের নিকট সমভাবে গ্রহণযোগ্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ জীবনপদ্ধতি। জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি জীবনের সকল দিক ও সমস্যার পথনির্দেশনা এতে দেয়া হয়েছে। ব্যক্তি, সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, বিজ্ঞান, যুদ্ধ-বিগ্রহ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক (International code) ইত্যাদি সকল বিষয়ে পরিপূর্ণ ও নিখুঁত বিধিনিষেধ রয়েছে ইসলামি জীবনব্যবস্থায়। অন্যান্য ধর্মের ন্যায় খ্রিষ্টধর্মেও কতিপয় নীতিবাক্য আর কল্পকাহিনি ছাড়া জীবনের বৃহত্তর পরিমণ্ডলের বিস্তৃত বিষয়াবলির জন্য বিশদ দিকনির্দেশনা দেয়া হয়নি। যে কেউ খ্রিষ্টধর্ম (Baptism) গ্রহণ করলেই তার সব পাপমোচন সমাপ্ত। জীবনাচরণে কর্মবন্ধন বা নীতি নৈতিকতার শৃঙ্খল তার জন্য অবারিত। কারণ যিশুখ্রীষ্ট (Jesus Christ) অনেক আগেই শুলিতে চড়ে নিজের সকল অনুসারীর পাপের অগ্রিম শাস্তি ভোগ করে গেছেন।



আলকুরআন ও আধুনিক বিজ্ঞান


দুনিয়া যত আধুনিক হচ্ছে সভ্যতা যত বিকশিত হচ্ছে ধর্মগুলো বিজ্ঞানের অবদানে প্রযুক্তির আক্রমণে গা সামাল দিতে না পেরে হতশ্রী হতে হতে অতীতের অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে। মানুষের ধর্মবিশ্বাসের উৎস ধর্মীয় গ্রন্থের কথিত ‘ঈশ্বরের বাণ’-র অসারতা, ভিত্তিহীনতা ও অযৌক্তিকতা বিজ্ঞান আজ নানাভাবে প্রমাণ করে দিচ্ছে। অন্যদিকে আধুনিক বিজ্ঞানের সাথি (Twin sister) হল আলকুরআন। বিজ্ঞান প্রতিনিয়ত আলকুরআনের উপস্থাপিত তথ্য, তত্ত্ব ও ইঙ্গিতগুলোকে বিস্তৃতরূপে আবিষ্কার করে চলেছে। বিজ্ঞানী H.R Hartsfield বলেন: We must not be surprised to find that Al-Quran is regarded as the foundation-stone of all the Sciences.

ফরাসি চিকিৎসা বিজ্ঞানী ড: মরিস বুকাইলি তার জগৎ বিখ্যাত ‘The Hundreds’ গ্রন্থটিতে দেখিয়েছেন বাইবেলের বর্ণনাগুলো বিজ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক অন্যদিকে আলকুরআনের সকল বর্ণনা আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে অত্যন্ত সুসামঞ্জস্যপূর্ণ (Coherence) ও সমন্বিত।



ক্রোসেড পরাজয়ের প্রতিশোধ


অবিকৃত বাইবেলে এমনকি বর্তমান বাইবেলের বিভিন্ন সংস্করণে মুহাম্মদ(সা)এর আগমনের স্পষ্ট ভবিষ্যৎ বাণী থাকা সত্ত্বেও আরবের খ্রিষ্টান পাদরিগণ সেদিন মুহাম্মদ (সা) কে শেষ নবি হিসেবে মেনে নিতে পারেননি। খ্রিষ্টানরা নিজেদের কুকর্ম, ষঢ়যন্ত্রসহ নানাবিধ অপরাধে মদিনার ইসলামি রাষ্ট্র হতে বহিষ্কৃত হয়েছিল। পরবর্তীতে সমগ্র আরব ভূখণ্ড থেকে বিতাড়িত হয়ে প্রতিশোধস্পৃহায় পুরো খ্রিষ্টজগৎ মুসলিমদের বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধে (Crusade) ঝাপিয়ে পড়ে। একদিকে ক্রুসেডের পরাজয়ের তপ্তজ্বালা অন্যদিকে যুগে যুগে মুসলিম পণ্ডিতগণের সাথে প্রকাশ্য বাহাসে (Debate) পরাজয়ের মর্মগ্লানি তারা কখনো ভুলতে পারেনি। তাই বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে এসে আরব ভূখণ্ডের চৌদ্দটি মুসলিম রাষ্ট্রের মাঝখানে তারা তথাকথিত ‘ইসরাইল রাষ্ট্র’ (Zionist Regime) প্রতিষ্ঠা করে মুসলমানদের চিরশক্তু ইহুদিদেরকে বিষফোঁড়ার মত বসিয়ে দিয়েছে আর তাদেরকে দুধকলায় পোষে পোষে এখন সেই ক্রোসেডের প্রতিশোধ নিচ্ছে।

মুসলিম জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধি

বর্তমান বিশ্বে মুসলিম জনসংখ্যা আড়াইশো কোটি বা তার চেয়ে বেশি। অথচ খ্রিষ্টানরা তথ্য গোপন করে তাদের মিডিয়া ও গবেষণা পুস্তকাদিতে এ সংখ্যা দেখিয়েছে কখনো একশ কোটি, কখনো একশ ত্রিশ কোটি বা দেড়শো কোটি ইত্যাদি। তারা পাঠ্যপুস্তক, রেফারেন্স গ্রন্থ, বিশ্বরেকর্ড ও বিভিন্ন নথিপত্রে অনেক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশকে খ্রিষ্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেখিয়েছে। আবার পৃথিবীর প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক অখ্যাত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ও অঞ্চলে মুসলিম জনসংখ্যার হার দেখিয়েছে প্রকৃত হারের চেয়ে অনেক কম। বর্তমানে আমেরিকাসহ পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে মুসলিম জন্মহার খ্রিষ্টান ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের চেয়ে অনেক বেশি এবং বিনা প্রচার প্রপাগান্ডায় নওমুসলিমদের (Converted Muslim) সংখ্যা দিনদিন যেভাবে বেড়ে চলেছে তাতে খ্রিষ্টজগৎ রীতিমতো শঙ্কিত। অথচ খ্রিষ্টানদের রয়েছে বিশ্বব্যাপী হাজার হাজার ইসলামবিরোধী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান, দাতব্য সংস্থা, এনজিও, মিশনারি প্রতিষ্ঠান ও ধর্মান্তরিতকরণের জন্য অঢেল ডলারের সরবরাহ। এতসব কিছুর পরও নওমুসলিম বৃদ্ধির সাথে তারা পাল্লা দিয়ে পেরে উঠছে না। এখানেই তাদের বড় মাথাব্যথা।



মুহাম্মাদ (সা:) এর অনুপম ব্যক্তিত্ব


বাইবেলে যিশুখ্রিষ্টের জীবনচরিত বিশদভাবে বর্ণিত হয়নি। তাঁর জীবনেতিহাস বা চরিত্রের বিভিন্ন দিকের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ বাইবেল বা অন্য কোথাও(Old Testament & New Testament) বিশ্বস্তসূত্রে লিপিবদ্ধ হয়নি। ফলে তাঁর একজন খাঁটি অনুসারী তাঁকে সঠিকভাবে অনুসরণ করতে ইচ্ছে করলেও পারবে না। যিশুখ্রিষ্ট (Jesus Christ) সম্পর্কে রয়েছে কিছু উদ্ভট অতিকথা, স্ববিরোধী ধর্মবাণী (The Gospel), অশ্লীল ও অতিমানবীয় বর্ণনা। অন্যদিকে মুহাম্মদ (সা) এর চরিত্র ও জীবনাচরণের সবকিছু হাদিস বর্ণানার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এমন নিখুঁতভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে যে, যে কেউ এখনো তাকে খুব সহজে ও পূর্ণরূপে অনুসরণ করতে পারে। অন্যদিকে মানব ইতিহাসে একমাত্র মুহাম্মদ (সা)-ই ছিলেন একাধারে একটি ধর্ম, একটি জাতি ও একটি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা (Thomas Carlyle)। কোন সন্ত্রাসী, নিষ্ঠুর ও অমানবিক চরিত্রের মানুষ কখনো লক্ষ লক্ষ মানুষের ভালোবাসা অর্জন করে তাদের হৃদয়ে স্থান করে নিতে পারে না এবং ইতিহাসের শ্রেষ্ঠমানবে পরিণত হতে পারে না। মাইকেল এইচ হার্টের ‘দ্যা হান্ড্রেড’(THE HUNDRED) বইটিতে তিনি মানবেতিহাসের সর্বাধিক প্রভাববিস্তারকারী একশজন মহামানবের তালিকায় (Ranking) মুহাম্মদ (সা) কে প্রথম স্থানে রেখেছেন।


বিশ্ব মোড়লগিরির বাসনা

খ্রিষ্টানরা কখনো ক্রুসেডের নামে কখনো পোপের নেতৃত্বে কখনো বুশ-ব্লেয়ারের ডাকে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিহাদ’ (War Against Terrorism) নাম ভাঙ্গিয়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে চেষ্টা করেছে। নামা অজুহাতে শক্তির দাপটে মুসলিম দেশগুলোতে আগ্রাসন, ধর্ষণ ও গণহত্যা চালানোসহ আন্তর্জাতিকভাবে কোন মুসলিম রাষ্ট্রকে কোনঠাঁসা করে রাখা ইত্যাদির মাধ্যমে তারা বর্তমান বিশ্বের ইসলামি পূণর্জাগরণকে দমিয়ে রেখে বিশ্বে তাদের একক আধিপত্য ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্নে বিভোর। স্নায়ুযুদ্ধোত্তর পরিবর্তিত বিশ্বপ্রেক্ষাপটে সম্মিলিত খ্রিষ্টানজগতে এখন মুসলিমবিশ্বকে একমাত্র প্রতিপক্ষ ভাবে। বিপুল জনসম্পদে ভরপুর মুসলিম বিশ্বের দেশগুলো এখন শিক্ষা, ঐশ্বর্য, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি এমনকি পারমাণবিক শক্তি অর্জনের দিক দিয়েও অনেকদূর এগিয়ে গেছে দেখে খ্রিষ্টানরা আজ দিশেহারা। তাই তারা সম্মিলিতভাবে আমেরিকা-ব্রিটেনের নেতৃত্বে গায়ের জোরে বিশ্বে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে।
The Trinity



কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.