Header Ads

Header ADS

পিএম খালী উচ্চ বিদ্যালয় আমার বেতনের টাকা খেয়েছে (!)


বেতনের টাকা

পিএম খালী উচ্চ বিদ্যালয় আমার বেতনের টাকা খেয়েছে (!)

-মুহাম্মদ দিদারুল আলম।

==========================

হে দারিদ্র্য তুমি মোরে করিয়াছ মহান, তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রিষ্টের সম্মানদারিদ্র্যের কশাঘাত কবি নজরুলকে মহান ও সম্মানিত করলেও আমার মনের মুকুরে চট্টগ্রামের বিখ্যাত রশিদ কাওয়ালের কে বলে পিরীত ভালো আমার ভালো হইলো কই…’ গানটিই বেশি অনুরণিত হয়। আজ যাপিত জীবনের ক্লেদজর্জরিত কিছু না বলা কথা না বললেই নয়।


আমি পঞ্চম শ্রেণিতে থাকাকালীন চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রীকে পড়াতাম। সেই ছাত্রীর বিয়ে হয় আমাকে তৃতীয় শ্রেণিতে গণিত পড়ানো জনৈক শিক্ষকের সাথে। জীবন উর্ণজালিকার ঘূর্ণিচক্রে সেই গণিত শিক্ষক যে স্কুলের প্রধান শিক্ষক সে স্কুলে আমার জীবনের প্রথম চাকুরি হয়। জীবনের এই পড়ন্ত বিকেলে সেদিনকার এক বিষাদঘন ঘটনার স্মৃতিরোমন্থন করতে যা্চ্ছি আজ।


শ্রদ্ধেয় রেজাউল করিম স্যার পিএম খালী উচ্চ বিদ্যালয়ের নামে প্রধান শিক্ষক হলেও বিদ্যালয়ের সর্বনিয়ন্তা ও সর্বভূক ছিলেন জুনিয়র শিক্ষক সুলতান মাহমুদ। তিনি ছিলেন রম্যপন্ডিত, ব্যঙ্গরসিক, ও বাগপটু শিক্ষক। যদিও আজ তিনি এ জীবনের সব লেনদেনচুকিয়ে অন্তিম শয়নে পরম শান্তিতে বিশ্রাম নিচ্ছেন।


বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি মমিন সাহেব ছিলেন একজন আপাদমস্তক রুচিশীল ভদ্রলোক ও ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতা। তাঁর কঠোর একনায়কতান্ত্রিক বিদ্যালয় পরিচালনার কারণে প্রধান শিক্ষকসহ সকলের নিকট তিনি ছিলেন সাক্ষাৎ যম। অন্যদিকে আমি তখন বাঁধভাঙা উত্তাল যৌবনের উদ্বেলিত তরুণ। ছাত্রজীবন তখনো পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। জড়িত ছিলাম ককসবাজার শহরের ছাত্ররাজনীতিতে। তাই ছাত্ররাজনীতির তপ্তবহ্নি শিখায় অবিরাম শোণিতধারা টগবগ করতো শিরায় শিরায়।


চাকুরিতে যোগদানের শুরু থেকেই সতীর্থ সহকর্মী শিক্ষকগণ সহজাত গুণে আমার ব্যাপারে সভাপতি মহোদয়ের কানভারী করে রেখেছিলেন। তারা আমাকে নিয়ে রিউমার ছড়িয়েছিলেন যে, নবাগত শিক্ষক একজন শিবির ক্যাডার (!)। সভাপতি সাহেবও বিষয়টিকে গুরুত্বসহকারে নিয়েছিলেন। তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসাবশত এর সত্যতা নিরূপণের জন্য একদিন বিদ্যালয়ে এলেন।


-আপনি নাকি শিবির করেন?’ তিনি জিজ্ঞেস করলেন।

আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, করি।

-চাকুরি করলে রাজনীতি করতে পারবেন না, একসাথে চাকুরি আর পলিটিক্স করা চলবে না।উনার সাফ কথা।

-রাজনীতি করা না করা আমার ব্যক্তিগত বিষয়। চাকুরিতে আমার রাজনীতির কোন খারাপ প্রভাব পড়বে না।

-না, আমার স্কুলে চাকুরি করলে আপনি শিবির করতে পারবেন না। হয় আপনাকে শিবির ছাড়তে হবে নতুবা চাকুরি ছাড়তে হবে।

এবার আমি স্বীয় আত্মবিশ্বাস আর বুকে অকুতোভয় সাহস সঞ্চয় করে বললাম,

-আমি শিবির ছাড়তে পারবো না, দুটোর কোন একটা যদি ছাড়তেই হয় তাহলে আমি চাকুরি ছেড়ে দিতে পারি। চাকুরি আমাকে সামান্য বেতন দেবে, কিন্তু শিবির আমাকে জান্নাতে নিয়ে যাবে। টাকার জন্য আমি আমার জান্নাত হারাতে চাই না।


অফিসজুড়ে পিনপতন নীরবতা। উপস্থিত কেউ আমার এমন প্রতিউত্তর আশা করেননি। অনুভব করলাম, ভয়ে আমার বুকটা দুরুদুরু কাঁপছে। এদিকে সভাপতি সাহেব রাগে ফুঁসছেন আর উন্মত্ত বিস্ফারিত রক্তচক্ষু নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। বুঝতে পারলাম আমার চাকুরি এবার বুঝি আর নাই। তবুও আমি আমার নৈতিক বিশ্বাসে দৃঢ়পদে অনড় থাকতে চেষ্টা করলাম। দেখি, আল্লাহ আমার রিজিক কোথায় রেখেছেন।


সেদিন আমি শিবির না হয়ে যদি তাদেরই দলের একজন নেতা বা কর্মী হতাম তাহলে তারা আমাকে জাতির সম্পদ গণ্য করে পুষ্পমাল্যে বরণ করে নিতেন।


আমি বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ককসবাজার শহর শাখার বৃহত্তর টেকপাড়া আবাসিক শাখায় দায়িত্বরত ছিলাম। তখন দেশজুড়ে চলছিল সরকার বিরোধী বিক্ষোভ। সরকারবিরোধী আন্দোলনে সারাদেশ উত্তাল-টালমাটাল, গণআন্দোলন ক্রমশ দানা বেঁধে উঠছিল আর দিনদিন জনতা ফুঁসে উঠছিল। সারাক্ষণ রাজপথ মুখরিত ছিল সরকারবিরোধী আন্দোলনের নানা কর্মসূচিতে। কয়েকদিন পরপর হরতাল অবরোধ। হরতাল পড়লে আমি বিদ্যালয়ে যেতাম না। কিন্তু ককসবাজার শহরে অবস্থানরত আমার অন্যান্য সহকর্মী শিক্ষকগণ বিকল্প পথে বা গ্রামের দীর্ঘ পায়ে হাঁটা পথ পাড়ি দিয়ে যেভাবেই হোক বিদ্যালয়ে চলে আসতেন। কেবল আমিই আসতাম না। বিষয়টি তারা কমিটির নজরে নিয়ে গেলেন। কমিটির সভাপতি আসলেন। অফিসে আমাকে ডেকে কোন ভূমিকা ছাড়াই তিনি হরতাল অবরোধে আমার কর্মস্থলে অনুপস্থিতির কারণ জানতে চাইলেন। আমি বললাম:


-হরতাল তাই আসি না।

-তাহলে একইস্থান (ককসবাজার শহর) থেকে অন্য শিক্ষকগণ কীভাবে আসেন?’ তিনি জানতে চান।

-আমি তো হরতালে গাড়ির অভাবে আসতে পারি না তা নয়। আসি না হরতাল বাস্তবায়ন করার জন্য।বললাম।

তিনি আমার সাহসভরা দরাজ কণ্ঠে এহেন অপ্রত্যাশিত প্রতিউত্তর শোনে রাগে গোস্বায় ফেটে পড়লেন আর বললেন,

-তার মানে? আপনি কী বুঝাতে চাচ্ছেন?’

-জ্বী, হরতাল ডাকা হয় যানবাহন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার জন্য। আর এ হরতাল আহ্বান করছে দেশের সব বিরোধীদল যৌথভাবে। সরকার বাদে বিরোধীদল দেশের জনসংখ্যার 70% থেকে 75%। আমিতো দেশের সিংহভাগ জনতার পক্ষে আছি। সরকারি দল অর্থাৎ মাত্র 25% বা 30% মানুষের সাথে থাকবো কেন?’


সভাপতি সাহেব আমার পৌরুষদীপ্ত কণ্ঠে এভাবে আত্মপক্ষ সমর্থন ও স্বঘোষিত রাজনৈতিক পরিচিতি তোলে ধরায় চরম হিংস্রাত্মক হয়ে উঠেছিলেন এবং ক্ষোভের অনলে দগ্ধ হয়ে সেদিন আমাকে অকথ্য অমার্জিত ভাষায় যা কিছু বলেছিলেন তা এখানে ব্যক্ত করাও অশালীন হবে। তখন সে মারমুখো পরিস্থিতিতে আমারও আর কোন কথা বাড়াবার মত সাহস ছিল না। এরপর থেকে আমাকে চাকুরি থেকে বরখাস্ত করার অফিসিয়াল প্রস্তুতি চলতে থাকে। এ বিদ্যালয়ের নিয়মানুসারে ইতিপূর্বে নিয়োগকৃত সকল শিক্ষকের কাছ থেকে যোগদানের সময়েই স্বহস্তে একটি লিখিত পদত্যাগপত্রেস্বাক্ষর নিয়ে রাখা হলেও আমার ক্ষেত্রে ভুলে কিংবা বিশেষ কারণবশত তা করা হয়নি।


পরবর্তীতে ধীরেধীরে পরিবেশ পরিস্থিতি পাল্টাতে থাকে। আমার সুনিপুণ, দক্ষতাপূর্ণ, কৌশলী ও রঙ্গরসাত্মক পাঠদানে শিক্ষার্থীমহলে আমার আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে। এলাকা ও অভিভাবক মহলেও আমার সুখ্যাতির সুবাতাস বইতে শুরু করে। আমিও ধীরেধীরে শান্ত সুবোধ বালকের মতো শিক্ষকতায় পেশাদারি ব্যক্তিত্ব প্রকাশে মনোনিবেশ করি।


ইতোমধ্যে আমার চাকুরির (এমপিও) ফাইল শিক্ষাবোর্ডে পৌঁছে গেছে। আগামী মাসেই এ্যরিয়েলসহ ছয়মাসের বেতন চলে আসবে। সেসময় চাকুরির (এমপিও) ফাইল তৈরি ও বোর্ডে পাঠাতে বিভিন্ন রকম ফি/খরচ বাবত প্রায় 5000/6000টাকা সংশ্লিষ্ট শিক্ষককেই বহন করতে হতো। আমি কপর্দকশূন্য বেকার তৎকালীন এত টাকা পাই কোথায়! অনন্যোপায় হয়ে বন্ধু রফিকুল আলমের কাছ থেকে এমপিও আসামাত্র পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে 5000/- টাকা ধার নিয়েছিলাম। জীবনের প্রথম চাকুরির বেতনের আশায় তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করতে থাকি আর ক্যালেন্ডারের পৃষ্ঠায় তারিখ গুণতে থাকি।


প্রতিকূলতার অনেককিছু একসময় প্রশমিত হয়ে গেলেও এই জংলি পরিবেশে বিশেষ করে এ ধরনের একজন রাজনৈতিক প্রতিহিংসুক স্বৈরাচারী সভাপতির অধীনে চাকুরি করা বা নিজের ভবিষ্যৎ সঁপে দেয়া কতটুকু নিরাপদ বা কতটুকু স্থায়ী হতে পারে তা ভেবে মাঝেমাঝে হতাশ হয়ে যেতাম। এভাবে সিদ্ধান্তহীনতায় ঢলতে ঢলতে চাঁদের দোলায় মেঘের দোলনায় দোলতে দোলতেএকদিন চাকুরি আমাকে ছাড়ার আগে আমি নিজেই চাকুরিকে গুডবাই জানিয়ে দিলাম। পরের মাসে আমার পাঁচ/ছয় মাসের বেতনসহ এমপিও চলে আসে। নিয়মানুযায়ী বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কর্মে অনুপস্থিত বা পদত্যাগী শিক্ষকের বেতনের বিল করতে পারে না। কিন্তু আমার অনুপস্থিতিতে আমার বেতনের টাকা তারা ফেরত পাঠাননি, আমাকেও দেননি। তাহলে সে টাকা কি করেছিলেন? তারা আমার স্বাক্ষর জাল করে আমাকে কর্মরত দেখিয়ে বেতনের বিল তৈরি করে ব্যাংক থেকে টাকা তোলে এনে নিজেরা ভাগবাটোয়ারা করে খেয়েছিলেন। সোলতান মাহমুদ ছিলেন এ নাটকের নাটের গুরু। হ্যাঁ স্যার, আপনি রাগ করবেন না। বর্তমানে আপনি যেহেতু চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন, আপনার আর এগুলো শোনে লাভ নেই। সেদিন আমার বেতন কেলেঙ্কারির কুশীলবদের যারা এখনো বেঁচে আছেন তারা শুনুন। আর পাঠকগণের মধ্যে যাদের ভালো লাগে তারাও শুনতে পারেন।


(ককসবাজার: 19/05/2023ইং)

টাকা


 

 

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.