তোমরা ভুলেই গেছ মল্লিকাদির নাম
তোমরা
ভুলেই
গেছ
মল্লিকাদির
নাম
-মুহাম্মদ দিদারুল আলম
আজ বছরের শেষদিন। সালতামামি চলছে।
- বলুনতো বছরটা কেমন গেল?
- কেন, এ বছর গতবছরের চেয়ে খারাপ। তবে আগামী বছরের চেয়ে ভাল।
যায়দিন ভালো, আসেদিন খারাপ। হারানো দিন সবসময় সুমধুর হয়। হারানো দিন মানে সোনালী দিন। তাই মানুষ বিতৃষ্ণ বর্তমানের ভগ্নতটে বসে অতীত বিরহবেদনায় নিরবে নিভৃতে কাঁদে। তবে অতি মাত্রার স্মৃতিকাতরতা একটি মনোরোগ।
উপমহাদেশের
বিখ্যাত সংগীতসাধক মো: রফির কন্ঠেও সেই হারানোদিনের ক্রন্দন-মার্সিয়া সুর মুর্ছিত হয়-
”হারানো দিন বুঝি আসিবে না ফিরে
মন কাঁদে কেন স্মৃতির তীরে”
অতীত-বিরহের গান গেয়েগেয়ে কিশোর কুমার নিজেই এখন অতীত-
”ফিরে চলে যায় যে সময় হায় একবার
তার যাওয়া আছে আসা নেই।
আজ আশা নেই, ভালোবাসা নেই….”
ফরিদা ইয়াছমিনের কন্ঠে হৃদয়ের তন্ত্রী ছেঁড়া অতীত হারানো বিরহগাঁথার কী নিষ্ঠুর মর্মভেদী
সুর-
”তোমরা ভুলেই গেছ মল্লিকাদির নাম
সে এখন গোমটাপরা কাজল বধু দূরের কোন গায়
যেদিন গেছে সেদিন কি আর ফিরিয়ে পাওয়া যায়”
আমিতো ব্যাকুল হয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মত এ গানটি বারবার শুনি বহুবার শুনি, তবু যেন আমার তৃষ্ণার্ত হৃদয়ের তৃপ্তি মেটে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা একদিন আবুজাফর স্যারকে জিজ্ঞেস করেছিল, স্যার, আপনার গানের মল্লিকাদি (মল্লিকা দিদি) কে? স্যার বলেছিলেন, আমি যখন চুয়াডাঙ্গা সরকারী কলেজে শিক্ষকতা করতাম মল্লিকাদি ছিল সে কলেজের ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্রী।
আমি ছাত্রজীবনে অবুঝ সবুজ সরলা অবলা এক ছাত্রী পড়াতাম। আমার প্রতি তার শ্রদ্ধা ছিল
আকাশচুম্বী ও
আন্তরিকতা
ছিল উন্মাদের মতপ্রায়।
মাবাবাকে
তো বলেই দিয়েছিল আমি ছাড়া অন্য কোন টিচারের কাছে সে পড়বে না।
একদিন সে পড়ানোর ফাঁকে ন্ত্রস্তচিত্তে কম্পিতস্বরে বলল,
-
স্যার, আজ একটা কথা বলব রাগ করবেন নাতো?
আমি বিস্ময় আর কৌতুহল নিয়ে বললাম,
-
কী এমন কথা অনুমতি নিয়ে বলতে হবে? আচ্ছা, বল কী বলতে চাও।
-স্যার, আমার তো একটা বড় ভাই নেই, তাই আপনাকে আমার ভাইয়ের মতই মনে হয়।
নিতান্ত সাদাসিদে নিরেট আন্তরিকতাপূর্ণ এ কথার গভীরতা সেদিন পরিমাপ করার কোন স্কেল আমার ছিল না। মেপে দেখার প্রয়োজনও মনে করিনি। বললাম,
-ও আচ্ছা এই কথা।
আমি কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে শিক্ষকসূলভ ধমকের সুরে বললাম,
-
দেখ, আমি তোমার শুধু শিক্ষক। আমার কাজ হল তোমাকে পড়ানো, আমি যা পড়াই তুমি তা পড়বে, এর বাইরে কোন কথা বলবে না। এই বলে তাকে মৃদু শাশিয়ে দিলাম।
আমি আজো কল্পনার চোখে সেদিনের তার লজ্জারাঙ্গা নিস্পাপ চাহনিটা দেখি আর ভাবি আহারে, আমার অপ্রত্যাশিত ধমক খেয়ে লাজুক মেয়েটি সেদিন কিভাবে নার্ভাস হয়ে একেবারে চুপসে গিয়েছিল।
ছাত্রীটি নবম শ্রেণিতে পড়ত। আমি তখন ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলাম। তাদের বিদ্যালয়ে আমার দলের প্রথম একটি ছাত্রীসমাবেশ আয়োজন করার পরিকল্পনা
করছিলাম।
সমস্যা হল আমি বহিরাগত একজন ছাত্র হয়ে ঐ স্কুলের হাজারখানেক ছাত্রীর কাছে যাই কিভাবে যেখানে দু’একজন ছাড়া কারো
সাথে আমার পরিচয় নেই। আজ আমার ছাত্রীটি যদি আমার দলের সমর্থক হতো তাহলে অন্তত মহাসমুদ্রে একটি ঢিল ছুড়া যেতো। কিন্তু আমার ছাত্রী ও তার পরিবারের সবাই আমার দলের বিরোধী। তবু উপায়ান্তর না দেখে সাহস করে একদিন পড়ানো শেষে ভয়েভয়ে বলেই ফেললাম,
-আজ তোমাকে একটা কথা
বলব।
তোমার একটু সহযোগিতা দরকার মানে তোমাকে আমার জন্য একটা কাজ করতে হবে, পারবে তো?
আমার ছাত্রী ক্ষণিক কালক্ষেপন না করে একেবারে
হর্ষোৎফুল্ল হয়ে
বলে ফেলল,
-
কী বলেন স্যার, আপনার জন্য দুনিয়ার যে কাজই বলুন আমি করতে রাজি আছি।
যাক, আপাতত মনে কিছুটা ভরসা পেলাম। আবার বললাম,
-আগামী বৃহস্পতিবার তোমাদের স্কুলে আমাদের সংগঠনের একটা ছাত্রীসমাবেশ করতে চাই। সমাবেশে শুধু আমি একাই থাকবো। তুমি এব্যাপারে আমাকে
একটু সহযোগিতা করতে পারবে?
অর্থাৎ আমার পক্ষ হয়ে ছাত্রীদের মাঝে প্রচার করতে হবে, ঐ দিন সমাবেশকক্ষে সবাইকে ডেকে নিয়ে আসতে হবে, সভা পরিচালনা করতে হবে এই আর কি। তোমরা তো আর আমার দল সমর্থন করনা তাই তোমাকে বলতে সংকোচবোধ করছি।
নারীসূলভ সহানুভূতি নিয়ে চরম মমতাময়ী
ছাত্রীটি বলল,
-স্যার আপনার জন্য শুধু আমার দলত্যাগ কেন, আরো যা-ই বলেন তাই করতে পারব।
সত্যিই সে অনেক ঝুঁকি মাথায় নিয়ে
নিজ পরিবারের পরোয়া না করে বহুকষ্টে সারাসপ্তাহ স্কুলের ছাত্রীদের কাছে গিয়ে আমার সমাবেশের
প্রচার করেছিল, ঐ দিন সবাইকে সমাবেশকক্ষে ডেকে নিয়ে এসেছিল
ও মঞ্চে সারাক্ষণ আমার সাথে থেকে মিটিং পরিচালনা করেছিল। এক কথায় পুরো বিদ্যালয়ের ছাত্রীদেরকে আমার সংগঠনে অর্গানাইজ করে দিয়েছিল। অথচ ক’দিন আগে আমি তার সামান্য আবদারকে স্বার্থপরের মত অবজ্ঞা করে ছুড়েঁ ফেলে দিয়েছিলাম।
বহুদিন পর কক্সবাজারের স্থানীয় পত্রিকা আমার লেখা একটি কবিতা ছেপেছিল যার প্রথম লাইন-
”কৃষ্ণচুড়ার রক্ত
মেখে এখনো বসন্ত আসেনি
তুমি জাগিও না, ঘুমাও চঞ্চলা এ্যানি…………”
(21/09/2022)

কোন মন্তব্য নেই